অর্থনীতি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে চলছে ২৩ ব্যাংক

বিনিয়োগের অন্যতম বাধা ঋণে উচ্চ হারের সুদ। অথচ ব্যাংকগুলো এই উচ্চ সুদারোপ থেকে সরে আসতে পারছে না। উল্টো আমানতকারীদের মুনাফা কমিয়ে দিয়েছে। ঋণ-আমানতের গড় সুদহার ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের নিচে রাখার নির্দেশনা থাকলেও অনেক ব্যাংক ধারাবাহিকভাবেই এই নির্দেশনা মানছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের  সর্বশেষ তৈরি করা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই মাস শেষে ২৩ ব্যাংকের স্প্রেড ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের ওপরে রয়েছে। এর ফলে একদিকে ব্যাংকে জমানো আমানতকারীরা পড়ছে বিপাকে, অন্যদিকে উচ্চ সুদ গুণতে গিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা।এ  প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যারা সীমিত আয় করেন কিংবা অবসর ভাতা ব্যাংকে জমা রাখেন, তাদের সুদের হার কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার অদক্ষ ব্যাংকারদের কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এর ফলে ঋণে সুদের হার কমাতে পারছে না।’ তিনি বলেন, ‘স্প্রেড কমানোর কথা না বলে বরং ব্যাংকগুলোকে পরিচালনা ব্যয়, বাহুল্য খরচ ও কুঋণ কমাতে বাধ্য করা দরকার।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তৈরি করা প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ঋণ গ্রহীতাদের কাছ থেকে গড়ে ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ হারে সুদ নিলেও ব্যাংকে জমানো আমানতকারীদের সুদ দিয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ হারে। এর মধ্যে ফারমার্স ব্যাংক গ্রাহককে ঋণ দিতে সুদারোপ করেছে ১৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। সুদারোপের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংক। এই ব্যাংক গ্রাহককে ঋণ দিতে সুদারোপ করেছে ১৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি স্প্রেড রয়েছে বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংকে। এই ব্যাংকটিতে স্প্রেড ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশীয় পয়েন্টে। এর পরেই ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ স্প্রেড বেড়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। এর পরে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ স্প্রেড বেড়েছে ডাচ বাংলা ব্যাংকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্প্রেড ৫ শতাংশের ওপরের তালিকায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ১টি, বেসরকারি ১৬টি ও বিদেশি ৬টি ব্যাংক। তবে জুলাই মাসে ব্যাংকিং খাতে গড় স্প্রেড দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। এর আগে টানা ৩ মাস বৃদ্ধির পর জুনে গড় স্প্রেড দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছিল।এদিকে, জুলাইয়ে ব্যাংকের ভোক্তা খাতে বিতরণ করা ঋণ বাদ দিয়েও স্প্রেডের হিসাব দেখিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রেও স্প্রেড সীমা বেশি রয়েছে ২২টি ব্যাংকের। এ তালিকায় বেসরকারি খাতের ১৫টি, বিদেশি খাতের ৫টি ও সরকারি খাতের ২টি ব্যাংকের নাম রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, আমানতের অনুপাতে ঋণের সুদ হার না কমায় স্প্রেড প্রত্যাশিত হারে কমছে না। এর জন্য খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিকেও দায়ী করেন তারা।গত ২১ জুন এক চিঠিতে ১৫ দিনের মধ্যে স্প্রেড ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে এসব ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুলাই শেষে আমানতের চেয়ে ঋণের সুদ তুলনামূলক কম কমেছে। এ সময়ে দেশের ৫৬টি ব্যাংকের ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ। যা আগের মাসে ছিল ১০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এ সময়ে আমানতের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। যা আগের মাসে ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আমানতের পাশাপাশি ঋণের সুদ কমায় জুলাইয়ে গড় স্প্রেড দশমিক ১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। যা জুনে ছিল ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। এছাড়া মে মাসে এ খাতে ৪ দশমিক ৯০ শতাংশীয় পয়েন্ট স্প্রেড ছিল। তবে এ সময়ে ব্যাংকিং খাতে গড় স্প্রেড ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করলেও বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড এখনও ৬ শতাংশীয় পয়েন্টর ওপরে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এপ্রিলে ব্যাংকগুলোর স্প্রেডের গড় হার ছিল ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। মার্চে ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড হার ছিল ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ ও ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ স্প্রেড কমিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা সত্ত্বেও গত কয়েক মাস ধরে স্প্রেড বাড়ছে।প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুলাই মাসে বিদেশি খাতের ৬টি ব্যাংকের স্প্রেড নির্ধারিত সীমার বাইরে রয়েছে। এগুলো হলো- স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের স্প্রেড ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশীয় পয়েন্ট, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ৬ দশমিক ৩০ শতাংশীয় পয়েন্ট, সিটি ব্যাংক এন এ ৬ দশমিক ২৩ শতাংশীয় পয়েন্ট, উরি ব্যাংক ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশীয় পয়েন্ট, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ৫ দশমিক ২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংক করপোরেশন লিমিটেডের (এইচএসবিসি) স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশীয় পয়েন্টে।এ সময়ে বেসরকারি খাতের ১৬ টি ও সরকারি খাতের একটি ব্যাংকের স্প্রেডও নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট। ওয়ান ব্যাংকের ৫ দশমিক ৯১ শতাংশীয় পয়েন্ট, আইএফআইসির ৫ দশমিক ৯২ শতাংশীয় পয়েন্ট, ইস্টার্ন ব্যাংকের ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট, দ্য সিটি ব্যাংকের ৫ দশমিক ১৫ শতাংশীয় পয়েন্ট, এবি ব্যাংকের ৫ দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট, পূবালী ব্যাংকের ৫ দশমিক ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট, উত্তরা ব্যাংকের ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশীয় পয়েন্ট ও ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশীয় পয়েন্ট স্প্রেড রয়েছে। এছাড়া নতুন প্রজন্মের ৯টি ব্যাংকের মধ্যে ৬টির স্প্রেড ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের ওপরে অবস্থান করছে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহা বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক চায় সব ব্যাংকের স্প্রেডসীমা ৫ শতাংশের নিচে থাকুক। কিন্তু বেশ কয়েকটি ব্যাংকের স্প্রেড সীমা ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের ওপরে রয়েছে। এটা দুঃখজনক।’ তিনি বলেন,‘ স্প্রেড সীমা ৫ শতাংশের নিচে নামাতে জুনেও ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছিল।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘বর্তমানে ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।’

ফেসবুক মতামত

জন মত দিয়েছেন

Show Buttons
Hide Buttons

সর্বশেষ খবর জানতে ফেসবুক এ আমাদের সাথে থাকুন

আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন খবর সংগ্রহ করে থাকি আপনারই জন্য। আমরা চাই আপনারা জানুন "সদ্য সংবাদ, সবার আগে"।


সর্বশেষ খবর জানতে ফেসবুক এ আমাদের সাথে থাকুন

আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন খবর সংগ্রহ করে থাকি আপনারই জন্য। আমরা চাই আপনারা জানুন "সদ্য সংবাদ, সবার আগে"।