জাতীয় ডাক্তারি

দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা ৩.৫ লাখ, বহন করছেন আরও ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ

থ্যালাসেমিয়া

ঢাকা শিশু হাসপাতালের হিসাবে, জটিল বংশগত রোগ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত দেশের সাড়ে তিন লাখ মানুষ। আর ব্যয়বহুল এই রোগের জিন বহনকরীর সংখ্যা এক কোটি দশ লাখ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা আর জন্মের আগেই মাতৃগর্ভে রোগ সনাক্ত করে এই রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।

যাত্রাবাড়ীর আব্দুল মালেক আর মুসতাহিদা বিয়ে করেছেন নয় বছর আগে। কিন্তু সরকারি চাকুরীজীবী এই দম্পত্তির দুজনই যে থ্যালাসেমিয়া জিনের বাহক তা জেনেছেন তাদের দ্বিতীয় সন্তান অসুস্থ হবার পরই। মালেকের মত শিশু হাসপাতালের এই ওয়ার্ডে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত সন্তানদের রক্ত দিতে প্রতিদিন ভিড় করেন অনেক বাবা মা। সারাদেশ থেকে আসা এসব শিশুদের ছোট শরীরে সূঁচ ফোটানোর কান্নায় ভারি হয়ে থাকে এখানকার পরিবেশ।

পোষাককর্মী রাশেদার দুই সন্তান ইয়াসিন আর ইয়ামিনও এখানে রক্ত দিতে আসে নিয়মিত। রক্ত দেয়ার পাশাপাশি অন্যসব দরকারি ওষুধ ও চিকিৎসা দিতে পারায় না এদের দুজনের অবস্থায় এখন খারাপের দিকে।

বিশেষজ্ঞরা বোলছেন, বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার মত সচেতনতা আর জন্মের আগেই মাতৃগর্ভে রোগ সনাক্তই কেবল পারে সারাজীবন ধরে বয়ে চলা জটিল বংশগত এই রোগ প্রতিরোধ করতে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও শিশু হাসপাতালের হিসেবে , দেশের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ নিজের অজান্তেই বয়ে বেড়াচ্ছে থ্যালাসেমিয়া রোগের জীন। মারাত্মক রক্তশূন্যতার এই রোগে আক্রান্ত সাড়ে তিনলাখ মানুষ। এমন বাস্তবতায় , রোগটি প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছরের মতো এবারও রাজধানীতে পালিত হচ্ছে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস।

থ্যালাসেমিয়া কি?

থ্যালাসেমিয়া হলো বংশানুক্রমে পাওয়া রক্তের একটি সমস্যা বা রোগ। রক্তে যদি স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন কম থাকে তাহলে থ্যালসেমিয়া হয়। এর ফলে রক্তশুণ্যতাও দেখা দিতে পারে। থ্যালাসেমিয়া গুরুতর না হলে চিকিৎসার তেমন প্রয়োজন নেই। তবে থ্যালাসেমিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করলে রুগীর শরীরে নিয়মিত রক্ত দিতে হয়।

থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ ও উপসর্গগুলো কি?

  • অবসাদ অনুভব
  • দূর্বলতা
  • শ্বাসকষ্ট
  • মুখ-মন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
  • অস্বস্তি
  • ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)
  • মুখের হাড়ের বিকৃতি, নাকের হাড় দেবে যাওয়া (মঙ্গোলয়েড ফেস)
  • শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া
  • পেট ফুলে যাওয়া
  • গাঢ় রঙের প্রস্রাব

চিকিৎসা :
থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা বলতে রক্ত পরিসঞ্চালন। আর মাঝে মাঝে অতিরিক্ত পরিসঞ্চালন জনিত আয়রণ উদ্ধৃতি ঠেকাতে আয়রণ চিলেশন থেরাপী, সাধারণত: ডেসফেরিঅক্সামিন দেওয়া হয়। ওষুধের চিকিত্সা বলতে এটুকুই। প্লীহা বড় হয়ে গেলে অপারেশন করে সেটা ছোট করে দেওয়া হয়। এতে রক্ত গ্রহণের হারটা কমে আসে কিছুটা। মূলত বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন হলো এর স্থায়ী চিকিত্সা। এটা খুবই ব্যায় বহুল। আমাদের পাশের দেশে বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনে খরচ পড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। আমাদের দেশে এই চিকিত্সা এখনো শুরু হয়নি। তবে আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে এটা বাংলাদেশেও করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলজী বিভাগ ও জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে বোনম্যারো চিকিৎসা হচ্ছে। তবে খরচ সাধারণের বাইরেই বলা চলে।

নিয়মিত যা করণীয়:
১।নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানো।
২।রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ১০ গ্রাম বা ডেসিলিটার রাখার চেষ্টা করতে হবে।
৩।হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের টিকা নেওয়া।
৪।শিশুরোগীর ক্ষেত্রে প্রতি তিন মাস অন্তর উচ্চতা, ওজন, লিভার ফাংশন পরীক্ষা করা।
৫।আট থেকে ১০ ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পর রক্তে লৌহের পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে।
৬।রক্তে লৌহের মাত্রা এক হাজার ন্যানো গ্রাম বা মিলি লিটারের ওপরে হলে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়া।
৭।বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন নিশ্চিত করা।
৮।শিশুর প্রতিবছর বুদ্ধি ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা।

প্রতিরোধে চাই সচেতনতা:

এ রোগ প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই। সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি বাড়াতে প্রচার মাধ্যমের ব্যাপক অংশ গ্রহণ প্রয়োজন। টেলিভিশন, পত্রিকা, রেডিও, ইন্টারনেট ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ব্লগ, টুইটারে ব্যাপক আলোচনা দরকার। গর্ভাবস্থায় রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করতে হবে। বিভাগীয় শহরগুলোতে অন্তত জেনেটিক পরামর্শকেন্দ্র স্থাপন করা দরকার। এ রোগটি একেবারে নির্মূল করতে জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে এই বিশাল সংখ্যার রোগীর যদি আর বৃদ্ধি না চাই, তাহলে এখনই আইন করে আন্ত-থ্যালাসেমিক পরিবারে বিয়ে বন্ধ করতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিনের বাহকদের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করতে হবে বা বিয়ে করলেও তারা সন্তান নিতে পারবে না। আমাদের দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিত্সার চেয়ে প্রতিরোধই সহজ। তাই একটি সমন্বিত স্বাস্থ্য কর্মসূচি ও পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগ দরকার ।

থ্যালসেমিয়া প্রতিরোধের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণঃ 

বিয়ে করুন রক্ত পরীক্ষা করে , তরুণ-তরুণী ও বন্ধুরা, বিয়ে করুন রক্ত পরীক্ষা করে। দয়া করে বিয়ের আগেই রক্ত পরীক্ষা করুন, দেখুন আপনি থ্যাসেমিয়ার ক্যারিয়ার কিনা।

পরীক্ষার নাম  হিমোগ্লুবিন ইলেক্ট্রোপ্রোসিস, বারডেমে, পিজিতে, সেনাহাসপাতালে ও আইসিডিডিআরবিতে এ পরীক্ষা হয়। ৪০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা খরচ পড়বে।

বিবাহিত জীবনে ভয়ানক সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য বিয়ের পূর্বেই প্রেমিকা-প্রেমিকারা ঢুকে পড়ুন একটি হাসপাতালে। বাংলাদেশে প্রতি হাজারে ০৭ জন লোক থ্যালাসেমিয়ার ক্যারিয়ার। রক্ত পরীক্ষ করে বিয়ে করার জন্য অপরকেও উৎসাহিত করুন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এ রোগটি ভয়াবহ পারিবারিক সমস্যা সৃষ্টি করবে। মনে রাখবেন, একটি পরিবারে একটি থ্যালাসেমিয়া রোগির জন্ম হওয়া মানে সারাজীবনের জন্য ওই পরিবারের সুখ-শান্তি শেষ হয়ে যাওয়া। এতে পরিবারটি শুধু আর্থিক সংকটেই নিপতিত হয় না-প্রিয়জন হারানোর ভয়েও সবসময় আতঙ্কিত থাকে। এবং শেষমেশ একদিন তাদের হারিয়ে সারাজীবন চোখের জলে ভাসে।

পরিশেষে: সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় নয় লাখ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম গ্রহণ করছে। বাংলাদেশে এর সংখ্যা হচ্ছে আনুমানিক ১০ হাজার। বিশ্বের কয়েকটি দেশ, যেখানে থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপ বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশী ছিল, সমন্বিত স্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে এ রোগে আক্রান্ত শিশুর জন্ম প্রায় শূন্য বা শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে তারা। উদাহরণস্বরূপ সাইপ্রাসের কথা বলা যেতে পারে। ১৯৭০ সালে সেখানে প্রতি ১৫৮ জন শিশুর মধ্যে একটি শিশু জন্ম নিত থ্যালাসেমিয়া নিয়ে, আজ সেখানে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা শূন্যের কোঠায়। গ্রিস, ইতালিসহ অনেক দেশই থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে। এগিয়ে আসতে হবে আমাদেরও। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি চাই ব্যক্তিগত সচেতনতা ।

 

ফেসবুক মতামত

জন মত দিয়েছেন

Show Buttons
Hide Buttons

সর্বশেষ খবর জানতে ফেসবুক এ আমাদের সাথে থাকুন

আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন খবর সংগ্রহ করে থাকি আপনারই জন্য। আমরা চাই আপনারা জানুন "সদ্য সংবাদ, সবার আগে"।


সর্বশেষ খবর জানতে ফেসবুক এ আমাদের সাথে থাকুন

আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন খবর সংগ্রহ করে থাকি আপনারই জন্য। আমরা চাই আপনারা জানুন "সদ্য সংবাদ, সবার আগে"।